29,185,530 YouTube Subscribers (all languages)

8,057 Success Stories

×

News-Details

news-1

ফাংশনাল মেডিসিন: একটি বিপ্লবের অপেক্ষায় গোটা বিশ্বের মেডিকেল চিকিৎসা ব্যবস্থা

22 Nov 2025

বর্তমান বিশ্বে ডায়াবেটিস, হার্ট ডিজিজ, কিডনি ডিজিজ, উচ্চরক্তচাপ, স্থূলতা, থাইরয়েড ডিজিজ, স্ট্রোক, আইবিএস ইত্যাদি নানা রকমের দীর্ঘমেয়াদি রোগে আক্রান্ত মানুষের সংখ্যা ভয়াবহ আকারে বেড়েই চলছে। সাথে অসংখ্য সিনথেটিক মেডিসিন হয়ে গেছে মানুষের নিত্যদিনের সঙ্গী। কিন্তু সাম্প্রতিক সময়ে ভিন্ন ধরনের অত্যন্ত যুগোপযোগী একটি বিশেষ বার্তা নিয়ে এসেছেন বাংলাদেশে “ফাংশনাল মেডিসিন” দর্শনের একজন শক্তিশালী পথিকৃৎ অধ্যাপক ড. মজিবুল হক।

তিনি আমেরিকার উইসকন্সিন-মিলোয়াকি ইউনিভার্সিটি থেকে মেডিসিনাল কেমিস্ট্রিতে ডক্টরেট ডিগ্রি অর্জনের পর ইউনিভার্সিটি অব টেক্সাসের মেডিকেল ব্রাঞ্চ থেকে তার পোস্টডক্টরাল রিসার্চ সম্পন্ন করেছিলেন। পরবর্তীতে আমেরিকার হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয় হতে নিউট্রিশন, হেল্থ অ্যান্ড ওয়েলনেস নিয়ে উচ্চতর পড়াশোনা করেন। অতঃপর তিনি আমেরিকার ফাংশনাল মেডিসিন ইউনিভার্সিটি থেকে ফাংশনাল মেডিসিন বিষয়ে বিশেষভাবে প্রশিক্ষণ নিয়েছেন এবং আমেরিকান ন্যাচারোপ্যাথিক বোর্ড জিইএমএ (GEMA) থেকে সার্টিফাইড ন্যাচারোপ্যাথিক চিকিৎসক হিসেবে বর্তমানে প্র্যাক্টিস করছেন এবং একইসাথে তিনি বর্তমানে আমেরিকান ইনস্টিটিউট অব রিজেনারেটিভ মেডিসিনের কোয়ান্টাম সেলুলার মেডিসিন বিভাগের কনসালটেন্ট এবং সেলুলার রিসার্চ টিম লিডার হিসেবে কর্মরত আছেন।

তার রচিত “সুস্থতার মূলমন্ত্র” বইটিতে (৭ম বই) তিনি প্রশ্ন তুলেছেন, “আমরা কি ঔষধের উপর নির্ভরশীল না হয়ে স্বাস্থ্যকর জীবনধারার মাধ্যমে শরীরকে সুস্থ রাখতে পারি না?” এই বইটিতে তিনি প্রথমবারের মত একজন বাংলাদেশী মেডিকেল গবেষক হিসেবে চিকিৎসাশাস্ত্রের নতুন একটি ধারা “ফাংশনাল মেডিসিন”-এর উপরে আলোকপাত করেছেন এবং এই দর্শনের ভিত্তিতে চিকিৎসার রূপরেখা তৈরি করে দিয়েছেন। সেই সাথে বিভিন্ন রিজেনারেটিভ থেরাপির বিজ্ঞানভিত্তিক প্রয়োগ ও বিভিন্ন রোগভিত্তিক সতন্ত্র (Personalised) ও সঠিক খাদ্যাভ্যাস গড়ে তোলার মাধ্যমে দীর্ঘমেয়াদি রোগসমূহের প্রকৃত সমাধানের পথ তুলে ধরেছেন। যার ফলশ্রুতিতে পাঠকমহলে আলোচনার অন্যতম কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হচ্ছে তার “সুস্থতার মূলমন্ত্র” বইটি।

আধুনিক সভ্যতার যাঁতাকলে পিষ্ট আজ প্রকৃতি ও জীবন। রোগাক্রান্ত প্রতিটি জীবনের করুণ আহাজারিতে আধুনিক চিকিৎসাব্যবস্থার আকাশ যেনো কুয়াশাচ্ছন্ন হয়ে পড়েছে, যেখানে রোগমুক্তির দিশা পেতে গিয়ে মানবজীবন হয়ে পড়েছে আজ দিশেহারা। রোগ-রণভূমের এই পোতাশ্রয়ে পীড়িত মানুষের সুস্থ জীবন ফিরে পাবার তীব্র আকাঙ্ক্ষা এবং সময়ের প্রয়োজনে আধুনিক চিকিৎসা ব্যবস্থার মধ্য দিয়ে আবির্ভূত এক বৈপ্লবিক পরিবর্তনই হলো "ফাংশনাল মেডিসিন", যেখানে রোগের মূল কারণ অর্থাৎ শরীরের অভ্যন্তরীণ ভারসাম্য নষ্ট হওয়ার উৎসগুলোকে সনাক্ত করার মাধ্যমে সম্পূর্ণ বিজ্ঞানভিত্তিক চিকিৎসা পদ্ধতির প্রয়োগ করা হয়।

একজন মানুষের খাদ্যাভ্যাস, ঘুম, মানসিক চাপ, অন্ত্রের স্বাস্থ্য, হরমোনের ভারসাম্য সবকিছুর সাম্যাবস্থার উপরেই মূলত সুস্থতা নির্ভর করে। অধ্যাপক ড. হক তার বইয়ে লিখেছেন, “রোগ কখনোই একদিনে আসে না, আসে আমাদের প্রতিদিনের অস্বাস্থ্যকর জীবনযাপন থেকেই।” আন্তর্জাতিক গবেষণাও এ কথাটিকে সমর্থন করে। PubMed এ প্রকাশিত সাম্প্রতিক গবেষণায় দেখা গেছে, টাইপ–২ ডায়াবেটিসে নিয়মিত ব্যায়াম, কম কার্বোহাইড্রেটযুক্ত খাবার, পর্যাপ্ত ঘুম ও মানসিক প্রশান্তি রক্তে গ্লুকোজ নিয়ন্ত্রণে ওষুধের মতোই কার্যকর (WHO, ADA, 2024)

ঔষধ কি তবে অপ্রয়োজনীয়? সত্যি বলতে আপনি যদি প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা রপ্ত করে রাখেন তবে সিনথেটিক মেডিসিন ছাড়াই আপনি অনায়াসে সুস্থভাবে জীবনযাপন করতে পারবেন। তবে ঔষধ একেবারে অপ্রয়োজনীয় নয়। কারন একিউট কন্ডিশনগুলো হতে দ্রুততম সময়ে নিস্তার পেতে সিনথেটিক মেডিসিন প্রয়োজন। এমনকি তাৎক্ষণিকভাবে মুমূর্ষু কোনো জীবন রক্ষা করতে সিনথেটিক মেডিসিনের বিকল্প নেই। তবে আপনি যদি স্বাস্থ্যকর জীবনযাপন প্রতিষ্ঠা করতে পারেন তবে ঐ একিউট কন্ডিশনগুলোতে আক্রান্ত হবার প্রবনতাও বহুলাংশে কমে যাবে। কাজেই সার্বিকভাবে ঔষধ সেবনের প্রয়োজনীয়তাও বহুলাংশে কমে যাবে।

ফাংশনাল মেডিসিন ধারার চিকিৎসা শুরু হয় রোগীর পরিপূর্ণ ইতিহাস ও ভারসাম্যহীন জীবনযাপনের তথ্য উপাত্তসমূহ বিশ্লেষণের মধ্য দিয়ে। ব্যক্তিগত খাদ্য পরিকল্পনা, প্রোবায়োটিক, ন্যাচারাল ডিটক্সিফিকেশন পদ্ধতি, স্ট্রেস ম্যানেজমেন্ট ইত্যাদির সমন্বয়ে শরীরের কোষীয় স্তরে স্বাভাবিক ভারসাম্য ফিরিয়ে আনার উদ্দেশ্য নিয়েই চিকিৎসা শুরু হয়। ফলে স্বাস্থ্যকর জীবনযাপন, সঠিক খাদ্যাভ্যাস ও বিভিন্ন পুষ্টির চাহিদা পূরণের মাধ্যমে শরীরের নিজের নিরাময় ক্ষমতা জেগে ওঠে, সিনথেটিক মেডিসিনের উপর নির্ভরতা ধীরে ধীরে কমে আসে। অধ্যাপক ড. মজিবুল হকের ভাষায়, “মানুষের শরীরই সবচেয়ে শক্তিশালী ফার্মেসি।” ফাংশনাল মেডিসিনের মৌলিক দর্শন মূলত এটাই। শরীরের প্রাকৃতিক নিরাময় শক্তিকে জাগিয়ে তোলাই ফাংশনাল মেডিসিনের মূখ্য উদ্দেশ্য। তবে ফাংশনাল মেডিসিন বিষয়ে অভিজ্ঞ একজন চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া নিজের ব্যক্তিগত সিদ্ধান্তে কোনো মেডিসিন বন্ধ করা যাবে না।

আজ যখন আধুনিক চিকিৎসাবিজ্ঞান প্রযুক্তির উৎকর্ষের শীর্ষে, তখনও আমরা দেখছি, মানুষ ক্রমেই ঔষধনির্ভরতার ফাঁদে বন্দি হয়ে পড়ছে। এই বাস্তবতার প্রেক্ষাপটে ফাংশনাল মেডিসিন উদ্ভাসিত হয়েছে এক নতুন দিগন্ত হিসেবে, যেখানে চিকিৎসা কেবল রোগ দমনের কৌশল নয়, বরং রোগের মূল কারণ বের করে শরীর, মন ও আত্মার সামগ্রিক সামঞ্জস্যতা ফিরিয়ে আনার এক পূর্ণাঙ্গ বিজ্ঞানভিত্তিক চর্চা।

পরিশেষে বলবো, আমরা ধীরে ধীরে বুঝতে শিখছি যে, প্রকৃত সুস্থতা হলো মূলত একটি নিরবিচ্ছিন্ন সুস্থ জীবনধারা। আর তা নিহিত আছে ফাংশনাল মেডিসিনের দর্শনের মাঝেই। কারণ "ফাংশনাল মেডিসিন" মূলত সাময়িক সময়ের জন্য উদ্ভূত কোনো চিকিৎসা পদ্ধতি নয়, বরং আধুনিক সভ্যতার সাথে অভ্যস্ত হয়ে ওঠা আধুনিক মানবের সমগ্র জীবনব্যাপী একটি সুস্থ, রোগমুক্ত ও ঔষধমুক্ত জীবনধারা বিনির্মানের উদ্দেশ্যে বিজ্ঞানভিত্তিক একটি বৈপ্লবিক চিকিৎসাব্যবস্থার নামই "ফাংশনাল মেডিসিন"।

Source link : https://www.protidinersangbad.com/life-style/health/541426